ফ্যাক্ট ফাইল: ল্যানসেটের আলোচিত নিবন্ধ কী বলেছে আর কী বলেনি

দেশের জনপ্রিয় পত্রিকা ইত্তেফাকের অনলাইন সংস্করণে মার্চের ২২ তারিখ  করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে কিছু চাঞ্চল্যকর দাবি সম্বলিত একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটের একটি নিবন্ধের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। তীব্র  সমালোচনার মুখে পরবর্তীতে তা মুছে ফেলা হয়েছে। ইত্তেফাক ছাড়াও ল্যানসেটের এই নিবন্ধটির বরাত দিয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর দাবি সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে, যা নিয়ে এখনও বিতর্ক চলমান। ল্যানসেটে ঠিক কী লেখা হয়েছে আর কী হয়নি – সেটাই যতটা নির্ভূলভাবে সম্ভব উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি আমরা।

বিস্তারিত

চলতি মাসের ১৫ তারিখ শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট একটি “কমেন্ট” বা মতামতভিত্তিক নিবন্ধ প্রকাশ করে, যার রচয়িতা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্রিশা গ্রিনহাল্জ-এর নেতৃত্বে মোট ছয়জন বিশেষজ্ঞর একটি দল।  তারা প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করে করোনাভাইরাসকে বায়ুবাহিত, অর্থাৎ বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে সক্ষম একটা ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করার দশটি বৈজ্ঞানিক কারণ দেখান।

ল্যানসেটের নিবন্ধে যাবার আগে বলে রাখা ভালো, করোনাভাইরাস সংক্রমণ সম্পর্কে বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত  ধারণা হলো আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে দেখা করলে, হাত মিলালে, জড়িয়ে ধরলে বা একই কক্ষে থাকলে ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হবার সম্ভাবনা থাকে। এই তত্ত্ব এটাও বলে যে আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশি দিলে তার শরীর থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্র ড্রপলেটের মাধ্যমেই ভাইরাসটি ছড়ায়।

ড্রপলেট বনাম এরোসল

নিবন্ধটির মূল বক্তব্য বুঝতে হলে ড্রপলেট এবং এরোসল বলতে কী বোঝায়, সে বিষয়ে মৌলিক ধারণা রাখা প্রয়োজন। ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, শ্বসনতন্ত্রের সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা ঠিক কীভাবে জীবাণু বাহিত হয় তার ব্যাখ্যায় ড্রপলেট এবং এরোসল-এর মধ্যে পার্থক্য করে থাকেন।

এয়ারবোর্ন বা বায়ুবাহিত রোগ ছড়ায় এরোসলের মধ্যমে। এরোসল হল শ্বাসতন্ত্র থেকে নিঃসৃত অতি ক্ষুদ্র তরল কণা যা শ্বাস ফেলা, কথা বলা বা কাশি দেওয়ার সময় তৈরী হয়। এই এরোসল কণা বাতাসে ভেসে বেড়ে এবং এতে সক্রিয় ভাইরাস বাহিত হয়। হাম, জলবসন্ত এই ধরণের বায়ুবাহিত রোগ।

আর বায়ুবাহিত ছাড়া শ্বসনতন্ত্রের অন্যান্য সংক্রামক রোগ ছড়ায় এরোসলের চেয়ে বড় ড্রপলেটের মাধ্যমে। এই ড্রপলেটগুলি সহজে বাতাসে ভাসে না এবং উৎসের এক থেকে দুই মিটারের মধ্যেই মাটিতে পড়ে যায়। ইনফ্লুয়েন্জা ড্রপলেটের মাধ্যমে বাহিত একটি রোগ।

কী কী বলেছে ল্যানসেটের নিবন্ধ

নিবন্ধটি শুরুতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে ২০২১ এর মার্চে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে , যেখানে বলা হয় করোনাভাইরাসের বায়ুবাহিত সংক্রমণের শক্ত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নি। ল্যানসেটের নিবন্ধের লেখকরা পর্যালোচনাটির এই সিদ্ধান্ত এবং তার ব্যাপক প্রচার জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন।  তার বিপরীতেই তারা বলছেন যে ড্রপলেট ছাড়াও আরও ক্ষুদ্র এরোসল ট্রান্সমিশনের ঘটনাও  ঘটছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে।

এরোসল অপেক্ষাকৃতভাবে ড্রপলেটের তুলনায় বেশি দূরত্ব পর্যন্ত যেতে পারে এবং বাতাসে ভাইরাস একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকার একটা সম্ভাবনাও এখানে আসে।

এরোসলের  মাধ্যমে  বিস্তারের প্রমাণ হিসেবে ল্যানসেটের নিবন্ধে দেখানো দশটি  যুক্তির প্রথমটায় বলা হয়েছে যে ভেন্টিলেশন থাকা ক্রুজ শিপ, কসাইখানা, বৃদ্ধাশ্রম এবং সংশোধন কেন্দ্রে দুরপাল্লার বিস্তারের  প্রমাণ রয়েছে।

দ্বিতীয় যুক্তিতে তারা বলেছে যে কোয়ারেন্টাইন হোটেলের পাশাপাশি কক্ষে থাকা কোভিড আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্বারা সুস্থরা আক্রান্ত হয়েছে পর্যাপ্ত  দুরত্ব বজায় রেখেও।

তৃতীয় যুক্তিতে বলা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে হাঁচি বা কাশির ঘটনা ছাড়াই তিনভাগের একভাগ সংক্রমণের ঘটনা ঘটছে। যাদের মাধ্যমে এই সংক্রমণগুলো হয়েছে তারা আক্রান্ত হবার কোনোপ্রকার লক্ষণ দেখা যায়নি। এই যুক্তির আওতায় নিবন্ধটি এটাও বলছে যে শুধুমাত্র কথা বলার মাধ্যমেই হাজারের উপর এরোসল পার্টিক্যাল (ক্ষুদ্র কণা) মানুষের মুখ থেকে বের হয়।

চতুর্থ যুক্তিতে বলা হয়েছে বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমণের আশংকা ঘরের বাইরের চেয়ে ভেতরে অনেক বেশি। তবে ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে এরোসল ট্রান্সমিশনের পরিমাণ কমানো সম্ভব।

পঞ্চম যুক্তিতে রয়েছে  স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে পিপিই (পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইক্যুইপমেন্ট) পরা অবস্থাতেও করোনায় আক্রান্ত হবার ঘটনা । পিপিই ড্রপলেটের বিপরীতে সুরক্ষা প্রদান করলেও অতি-ক্ষুদ্র এরোসল পার্টিক্যালের বিপরীতে পুরোপুরি সুরক্ষা প্রদান করতে পারে না।

ল্যানসেটের নিবন্ধটির ষষ্ঠ যুক্তি হলো, ল্যাবরেটরি টেস্টে বাতাসে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা পর্যন্ত ভাইরাস বাতাসে সক্রিয় অবস্থায় ছিলো। করোনাভাইরাস রোগী থাকা কক্ষেও বাতাসে ভাইরাসের অস্তিত্ব দেখা গিয়েছে।

তবে অধ্যাপক গ্রিনহাল্জ ও তার দল এ-ও বলেছেন যে বাতাসে ভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত করাটা বেশ জটিল একটা প্রক্রিয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নমুনা নেবার জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি যেমন থাকে না তেমনি নমুনা সংগ্রহের পরে টেস্ট করার আগেই সেটা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবার একটা সম্ভাবনা থাকে। তারা উল্লেখ করতে ভোলেন নি যে এখন পর্যন্ত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানো দুটি রোগ, যক্ষ্মা এবং হামের ভাইরাস কেউই বাতাস থেকে নিতে পারেনি।

সপ্তম যুক্তিতে বলা হয়েছে, কোভিড রোগী থাকা হাসপাতালের এয়ার ফিল্টার এবং বিল্ডিং ডাক্টে (বাতাস চলাচলের পাইপ) করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ভাইরাসটি কেবলমাত্র এরোসোলের মাধ্যমেই সেসব স্থানে যেতে সক্ষম।

অষ্টম যুক্তিটি হলো, খাঁচায় রাখা প্রাণীদের উপর গবেষণাতেও বাতাসের মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রমাণ মিলেছে। বাতাস চলাচলের পাইপ দ্বারা সংযুক্ত দুটি খাঁচার ভেতর একটি খাঁচায় থাকা অসুস্থ প্রাণী দ্বারা আরেকটি খাঁচায় থাকা সুস্থ প্রাণী আক্রান্ত হয়েছে।

নয় নম্বর যুক্তিতে বলা হচ্ছে যে করোনাভাইরাস যে বায়ুবাহিত নয়, এমন কোনোকিছু অন্য কোনো গবেষকদল এখনো প্রমাণ করতে পারেনি।

পরিশেষে, দশ নম্বর যুক্তিতে  বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে হাম এবং যক্ষ্মার মতন রোগগুলি ড্রপলেটের মাধ্যমে কাছাকাছি থাকা মানুষদের ভেতর ছড়ায় বলে ধারণা করা হতো। কিন্তু  এখন এটা স্পষ্ট যে এই রোগগুলো এরোসলের মাধ্যমে খানিকটা দূরে থাকা মানুষকেও আক্রান্ত করতে পারে।

“ড্রপলেটের ভেতর বেশি ভাইরাস থাকে, তাই সেটার আক্রান্ত করার সম্ভাবনা বেশি,” এমন যুক্তিকেও খন্ডন করা  হয়েছে এই পর্যায়ে এসে। তারা গবেষণায় দেখেছেন, যে মাপামাপির পর অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের এরোসলেই  বরং বেশি পরিমাণে ভাইরাস কণিকার  সন্ধান পাওয়া যায়।

নিবন্ধের  রচয়িতা যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাজ্য ও কানাডার ছয় বিশেষজ্ঞ গণস্বাস্থ্য কর্মীদের  অনুরোধ করেছেন, করোনাভাইরাসকে একটি বায়ুবাহিত  ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করে তারা যেন সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

ল্যানসেটের নিবন্ধ যা যা বলেনি

দেশের জনপ্রিয় পত্রিকা ইত্তেফাকের অনলাইন সংস্করণে মার্চের ২২ তারিখ দুপুরবেলা প্রকাশিত প্রতিবেদন ল্যানসেটের নিবন্ধটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে দাবি করেছিল  যে “কোভিড কোনমতেই হাঁচি, কাশি, কফ, থুতু দিয়ে ছড়ায় না”। প্রকৃত অর্থে ল্যানসেটের জার্নালে এরকম কোনোকিছুই বলা হয় নি।

সেখানে বলা হয়েছে, এখনকার প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ঘরের ভেতরে বা বাইরের মধ্যে সুরক্ষার জন্য আলাদা আলাদা কোন ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন নেই, কারণ মধ্যাকর্ষণের টানে ভেতরে বা বাইরে জীবাণুবাহী ড্রপলেট একই ভাবে নড়বে । কিন্তু জীবাণু যদি বায়ুবাহিত হয় তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস ফেলা, কথা বলা, চিত্কার করা, হাঁচি বা কাশি থেকে বের হওয়া এরোসল অন্যদেরকে নিঃশ্বাসের মাধ্যমেই আক্রান্ত করতে পারে।

এছাড়াও, ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে ল্যানসেটের জার্নাল প্রকাশের তারিখ হিসেবে দেখানো হয়েছে এপ্রিল ১২, যেটা ভুল তারিখ। ভুল তথ্যে ঠাসা সেই প্রতিবেদনটি ইত্তেফাক সরিয়ে ফেললেও সেটার গুগল ক্যাশে ভার্সন দেখতে পাবেন এখানে ক্লিক করলে

অন্যদিকে, চলতি মাসের তেইশ তারিখে প্রকাশিত হওয়া এখনই ডট কমের একটি প্রতিবেদনেও ল্যানসেটের জার্নালকে ভুলভাবে ব্যখ্যা করা লেখা হয়েছে যে “স্কুল-কলেজ খুললে শিশু-কিশোরদের করোনা ঝুঁকি কমবে।” ফ্যাক্ট ওয়াচ টিম পুরো নিবন্ধে এরকম কোনো তথ্য খুঁজে পায়নি। স্কুল, কলেজ বা শিক্ষার্থী শব্দগুলো জার্নালে ব্যবহারই করা হয়নি।

ল্যানসেটের নিবন্ধটিতে বিশেষজ্ঞরা করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় নেওয়া বর্তমান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন নি, বরং করোনাভাইরাস যে বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিয়ে বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

তাদের মতে, ভাইরাসের বায়ুবাহিত বিস্তার রোধে আমরা যেন  নিঃশ্বাসের সাথে বাতাসে সংক্রামক এরোসল না নেই, সেজন্য অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে : ঘরের  বাতাস চলাচল, পরিশোধন, ভিড় কমানো, আবদ্ধ স্থানে সময় কাটানো সীমিত করা, যেকোন আবদ্ধ জায়গায় বা ঘরের ভেতরে থাকলে মাস্ক পরে থাকা, মাস্কের গুণগত মান এবং মাপমত হওয়া নিশ্চিত করা।  সেইসাথে স্বাস্থ্যকর্মী ও সম্মুখ কর্মীদের জন্য দিতে হবে উন্নততর সুরক্ষা সরঞ্জাম।

ল্যানসেটের নিবন্ধের রচয়িতা বিশেষজ্ঞদের তালিকা

ট্রিশা গ্রিনহাল্জ ডিপার্টমেন্ট অব প্রাইমারি কেয়ার হেলথ সায়েন্সেস, ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, যুক্তরাজ্য 
হোসে হিমেনেজ ডিপার্টমেন্ট অব কেমিস্ট্রি এন্ড কোঅপারেটিভ ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ ইন দা এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস, ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো, মার্কিন যুক্তরাজ্য
কিম্বারলি প্র্যাথার স্ক্রিপ্স ইনস্টিটিউশন অব ওশেনোগ্রাফি, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া স্যান ডিয়েগো, মার্কিন যুক্তরাজ্য
জেয়নেপ তুফেকচি স্কুল অব ইনফরমেশন এন্ড লাইব্রেরি সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা, মার্কিন যুক্তরাজ্য
ডেভিড ফিশম্যান ডালা লুনা স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো, কানাডা
রবার্ট স্কুলি ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন, ডিভিশন অব ইনফেকশাস ডিজিজেস এন্ড গ্লোবাল পাবলিক হেলথ, স্কুল অব মেডিসিন, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া স্যান ডিয়েগো, মার্কিন যুক্তরাজ্য

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *