হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে অগ্নিদগ্ধ হবার ঝুঁকি আছে কি?

যথাযথ ব্যবহারবিধি মেনে চললে হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিরাপদ। কিন্তু বিপুল পরিমাণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার আগুনের শিখার সংস্পর্শে আসলে সেখান থেকে অগ্নিদগ্ধ হবার ঝুঁকি রয়েছে। এমন দুর্ঘটনা বিরল হলেও সংবাদপত্র প্রাপ্ত বিবরণের ভিত্তিতে চিকিৎসক দম্পতি ডা. রাজিব ভট্টাচার্য ও ডা. অনূসূয়া ভট্টাচার্য এ ধরনের অগ্নিকান্ডের শিকার বলেই ধারনা করা যায়।

২১ জুলাই দিবাগত রাত দেড়টার দিকে অগ্নিদগ্ধ হন চিকিৎসক দম্পতি ডা. রাজিব ভট্টাচার্য ও ডা. অনূসূয়া ভট্টাচার্য। প্রতিবেশীরা তাদেরকে সংকটাপন্ন অবস্থায় উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন রাতেই। পরবর্তিতে ডা. রাজিব ভট্টাচার্য মৃত্যুবরণ করেন।

বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, রাজিব ভট্টাচার্য একটি বড় বোতল থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ছোট বোতলে ঢালছিলেন। তখন বোতল থেকে স্যানিটাইজার পড়ে গেলে সিগারেট বা কয়েলের আগুনের সংস্পর্শে তার শরীরে আগুন ধরে।

এই তথ্যের উত্স হিসেবে ডেইলি স্টার জানিয়েছে ডা. রাজিবের বন্ধু ডা. সুদীপ দের কথা অন্যদিকে প্রথম আলো উল্লেখ করেছে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ডা. সামন্ত লাল সেনের নাম। কালের কণ্ঠ তাদের তথ্যের জানিয়েছে কলাবাগান থানার ওসি পরিতোষ চন্দ্র তাদের তথ্যের উত্স। কিন্তু কোনখানেই আগুন ঠিক কীভাবে লেগেছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে কি এরকম ভয়াবহ দুর্ঘটনা সত্যি ই লাগতে পারে? আমরা করোনাকালে যেভাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করছি তাতে আমাদের সবারই অগ্নিদগ্ধ হবার ঝুঁকি তৈরী হচ্ছে কি? এরকম ঘটনা কি বিশ্বের অন্য কোথাও ঘটেছে?

এই বিষয়ে সংশয় তৈরী হবার একটি কারণ হল হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে অগ্নিকান্ডের বেশ কিছু গুজব দেশে বিদেশে ইতিমধ্যেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হয়েছে হাত পুড়ে যাওয়া এবং গাড়িতে আগুন ধরে যাবার গুজব।

কিন্তু ডা. রাজীব ও ডা. অনুসূয়ার এই ভয়াবহ পরিণতির ব্যাখ্যা তাহলে কী হতে পারে?

একথা নিশ্চিত যে এলকোহল থাকার কারণে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দাহ্য, যেকারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকার সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) এর ব্যবহারবিধির মধ্যে অগ্নি নিরাপত্তা সতর্কীকরণ দিয়ে থাকে। হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল আগুনের উত্স থেকে দুরে রাখতে বলা হয়। প্লেনে ওঠার সময়ও বেশি পরিমানে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বহন করা নিষেধ

কিন্তু সিডিসি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উভয়ের মতেই স্যানিটাইজার থেকে অগ্নিকান্ড ঘটার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি ওয়েব পেইজে বলা হয়েছে, স্যানিটাইজার থেকে আগুনের ঝুঁকির চাইতে রোগ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। যথাযথ ব্যবহারবিধি মেনে চললে স্যানিটাইজার ব্যবহার নিরাপদ কারণ এর দাহ্য বাষ্পীয় এবং তরল অংশ হাতে মাখার কিছুক্ষণ পর উবে যায়। হাতে ২০ সেকেন্ড ধরে ঘষলে তা পুরোপুরি শুকিয়ে যায়।

তবে, ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা পলিটিফ্যাক্ট-এ প্রকাশিত বিশেষজ্ঞর মতামত অনুযায়ী, কেউ যদি বিপুল পরিমাণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করে খোলা আগুনের শিখার সংস্পর্শে আসে, তাহলে অগ্নিদগ্ধ হবার সম্ভাবনা আসলেই রয়েছে। ডা. রাজীবের বাড়ির মেঝেতে পড়ে যাওয়া স্যানিটাইজারে কয়েল বা সিগারেট পড়ে গিয়ে থাকলে এই বিরল দুর্ঘটনাটিই ঘটে থাকতে পারে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

সুতরাং, বিপুল পরিমাণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার জ্বলন্ত অগ্নিশিখার সংস্পর্শে আসলে সেখান থেকে অগ্নিদগ্ধ হবার ঝুঁকি রয়েছে, যদিও তা ক্ষীণ। হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিরাপদে ব্যবহার ও মজুত করতে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য জেনে নিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এর ওয়েবসসাইট থেকে।

আপডেট: পণ্যের গায়ে আগুন বিষয়ক সতর্কতামূলক লেবেল/স্টিকার

আগুনের এ ধরণের ঝুঁকি এড়াতে, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মতো অন্যান্য দাহ্য উপাদানবিশিষ্ট দ্রব্যে (জীবাণুনাশক স্প্রে, অ্যান্টিসেপ্টিক ও পরিষ্কারক) সতর্কতামূলক লেবেল যুক্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। (সূত্র, ১৯শে জুলাই, প্রথম আলো)

 

তথ্যসূত্র

অগ্নিকান্ড বিষয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনঃ যুগান্তর, ডেইলি স্টারপ্রথম আলো, ও কালের কণ্ঠ

হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে অগ্নিকান্ডের বেশ কিছু গুজব পড়তে পয়েন্টারের প্রতিবেদন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অগ্নি নিরাপত্তামূলক সতর্কীকরণ

“অগ্নি নিরাপত্তা এবং অ্যালকোহল ভিত্তিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার”

এ বিষয়ে আরও দেখুন

সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের পিডিএফটি পড়ুন এখানে

ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা পলিটিফ্যাক্টের প্রতিবেদন

আপনি কি এমন কোন খবর দেখেছেন যার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন?
কোন বিভ্রান্তিকর ছবি/ভিডিও পেয়েছেন?
নেটে ছড়িয়ে পড়া কোন গুজব কি চোখে পড়েছে?

এসবের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে জানান।
আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ fb.com/search.ulab

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *