রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য

Published on: June 10, 2024

সম্প্রতি বাংলাদেশে পদ্মা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাপের কামড়ে মৃত্যু হওয়ায় এই সাপ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক মাধ্যমে রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে একাধিক তথ্য সংবলিত একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। তবে, ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন (Deep Ecology and Snake Conservation Foundation) নামক একটি সংগঠন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই পোস্টের বেশকিছু তথ্যকে অসত্য এবং বিভ্রান্তিকর বলে চিহ্নিত করেছে এবং উক্ত তথ্যগুলোর বিপরীতে সঠিক তথ্য সরবরাহ করেছে। এই সংগঠনটি বিপদগ্রস্ত সাপ উদ্ধার এবং সাপ সংরক্ষণের কাজে নিয়োজিত। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফ্যাক্টওয়াচ সামাজিক মাধ্যমে শেয়ারকৃত পোস্টের দাবিকে “আংশিক মিথ্যা” বলে সাব্যস্ত করছে।

 

অনুসন্ধান:

রাসেলস ভাইপার সম্পর্কিত একাধিক তথ্য সংবলিত পোস্টের বিপরীতে ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন (DESCF) গত ০৯ জুন ২০২৪ এ তাদের ফেসবুক পেইজ থেকে একটি পোস্ট শেয়ার করেছে। উক্ত পোস্টে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ারকৃত রাসেলস ভাইপার সাপকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য সংবলিত পোস্টের বিপরীতে সঠিক তথ্য প্রদান করা হয়েছে। পাঠকদের সুবিধার্থে প্রত্যেক বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিপরীতে প্রাপ্ত সঠিক তথ্য সহকারে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

 

ভাইরাল পোস্ট কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য: রাসেলস ভাইপার সাপের বিশেষত্ব হচ্ছে, এরা খুবই বিষধর। কাউকে ছোবল দিলে এন্টি-ভেনম দিলেও বাঁচার সম্ভাবনা ২০%। এটার এন্টি-ভেনম নাই বাংলাদেশে।

DESCF এর বক্তব্য: “সময় মতো অ্যান্টিভেনম দিলে বাঁচার সম্ভাবনা শতভাগ। ওঝার কাছে গিয়ে, সাপ মারতে গিয়ে বা হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য সাপ মারতে গিয়ে সময় নষ্ট করলে বিষে জটিলতা দেখা দেয়। ডেইলি স্টারে প্রকাশিত তথ্য মতে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কেবল রাজশাহী অঞ্চলেই চন্দ্রবোড়ার দংশনে ২০২ জন চিকিৎসা নিতে আসেন এবং ৬২ জন মারা যান। মানে এখানে মৃত্যুর হার প্রায় ৩১%। যুগান্তরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী যারা মারা যায় তাদের প্রায় ৬০% অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পরেও মারা যায়। আমরা ধরতে পারি সেই ৬২ জনের মধ্যে মোটামুটি ৩৭ জন অ্যান্টিভেনম নিয়েও মারা যায়। হেমোটক্সিন বিষ রক্ত যায় এমন সব অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করে যা সারানো অ্যান্টিভেনমের কাজ নয়। রাসেলস ভাইপারের কামড়ে অ্যান্টিভেনম নেবার পর এই সব অঙ্গের জন্য অতিরিক্ত চিকিৎসা করাতে হয়। তবে পয়সার অভাবে অনেকে এই পরবর্তীকালীন চিকিৎসা করাতে পারেন না, তাই মারা যান। এই ঘটনা চন্দ্রবোড়া যে সব দেশে আছে সে সব দেশেই হয়। দেশে এটার কার্যকর অ্যান্টিভেনম আছে। পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম দিয়ে দেশের সব বিষধর সাপের কামড়ের চিকিৎসা করা হয়। তবে শুধু এই সাপের জন্য ঐ অতিরিক্ত চিকিৎসা করাতে হয় নইলে অ্যান্টিভেনম দিয়ে বিষ নষ্ট হলেও অঙ্গ নষ্ট হয়ে রোগী মারা যায়, মনে হবে অ্যান্টিভেনম বুঝি কাজ করে না।”

 

ভাইরাল পোস্ট কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য: বাংলাদেশের জলবায়ু এবং প্রকৃতিতে রাসেলস ভাইপার সাপের কোন অবদান নাই।

DESCF এর বক্তব্য: “রাসেলস ভাইপার আমাদের দেশের স্থানীয় সাপ। এটা সাকারমাউথ ক্যাটফিশের মতো বাইরের দেশের নয় যে দেশের প্রকৃতিতে কোনো অবদান রাখে না। ইনভেসিভ বা আক্রমণাত্মক হলে সরকার যেমন পিরানহা ও সাকারমাউথ ফিশ নিয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তেমন এটার জন্যও দিতো।”

 

ভাইরাল পোস্ট কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য: ভয়ংকর ব্যাপার হল অন্যান্য সাপ সাধারণত নিজেরা আক্রান্ত হলে কিংবা সরাসরি কারও সামনে পড়লে ছোবল দেয়। অন্যথায় কামড় দিতে আসে না বরং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রাসেলস ভাইপার দূর থেকে মানুষ দেখলেও তেড়ে আসে আর কামড় দেওয়ার চেষ্টা করে।

DESCF এর বক্তব্য: “পৃথিবীর সব সাপই শত্রু দেখলে এড়িয়ে যাবার পা পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কারও উপর বিরক্ত না হলে কোনো সাপই আক্রমণ করবে না। তবে আমাদের কোন কাজ তাদের বিরক্ত করবে সেটা তারাই জানে। তাই আপনি ঝোঁপের পাশে কাজ করতে গিয়ে বা ধানখেতে কাজ করতে হঠাৎ লুকিয়ে থাকা সাপের কামড় খেয়ে ফেলতে পারেন। হয়তো বুঝতেও পারবেন না যে কোন সাপ কামড়ালো। তারা আমাদের কোন কাজকে ক্ষতিকর মনে করলো তাও বুঝতে পারবেন না। তবে আপনার কোনো না কোনো কাজে সে অবশ্যই ভয় পাবে। এটা পৃথিবীর বিষধর, নির্বিষ সমস্ত সাপের জন্য প্রযোজ্য। সব সাপ ওঁত পেতে শিকার করে। তেড়ে আক্রমণ করা ওদের বৈশিষ্ট্য নয়। ভাইপাররা আরও অলস। শিকারের আশায় ঘাসের মধ্যে কুণ্ডলি পাকিয়ে লুকিয়ে পড়ে থাকে। আপনি অজান্তেই কামড় খেয়ে ফেলতে পারেন। সাপের দৃষ্টি ভালো নয়। দূর থেকে মানুষ না গরু সেটা আলাদা করতে পারে না। গন্ধ শুঁকে ও নড়াচড়া বুঝে শিকার শনাক্ত করে। যাদের পিট অর্গান আছে তারা তাপমাত্রার তফাত বোঝার চেষ্টা করে।”

 

ভাইরাল পোস্ট কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য: অন্য সাপ ১ রকম বিষ ধারন করলেও রাসেল ভাইপারের বিষ একই সাথে ৫/৬ ধরনের হয়।

DESCF এর বক্তব্য: “সব সাপেরই একাধিক বিষ থাকে।”

 

সকল বিষধর সাপের একাধিক বিষ থাকার বিষয়টি নিয়ে আমরা ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের কনটেন্ট স্পেশালিষ্ট রাশিক আজমাইনের সাথে কথা বলেছি। তিনি আমাদের জানান, “বিষধর সাপের একটি মুখ্য (Prominent) বিষের পাশাপাশি অন্যান্য বিষও থাকে। সেগুলোর প্রভাব থাকলেও তা মুখ্য বিষের চেয়ে কিছুটা কম। উদাহরণস্বরূপ, কোবরা, ক্রেইট, সামুদ্রিক সাপ, কিং কোবরা, কোরাল স্নেক, মাম্বা, তাইপেন, প্রভৃতি সাপের মুখ্য বিষ হচ্ছে নিউরোটক্সিন। গোখরা সাপ তার মুখ্য নিউরোটক্সিন বিষের পাশাপাশি অল্প পরিমাণ কার্ডিওটক্সিন বিষও ধারণ করে। এই বিষ হৃদপিণ্ডে প্রভাব ফেলে। কিং কোবরা সাপ তার নিউরোটক্সিন বিষের পাশাপাশি অল্প পরিমাণ সাইটোটক্সিন এবং কার্ডিওটক্সিন বিষ ধারণ করে। রাসেলস ভাইপারের ক্ষেত্রে তারা অন্য সকল ভাইপারের মতোই হেমোটক্সিন বিষ ধারণ করে। তবে, এই সাপ তার মুখ্য বিষের পাশাপাশি অল্প পরিমাণে নিউরোটক্সিন, মায়োটক্সিন, এবং নেফ্রোটক্সিন বিষ ধারণ করে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া পোস্টে উল্লেখিত রাসেলস ভাইপার সাপের একাধিক বিষ থাকার তথ্যটি সত্য। তবে, অন্যান্য বিষধর সাপের একটিমাত্র বিষ থাকার তথ্যটি সঠিক নয়।”

 

তাছাড়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত RUSSELL’S VIPER (DABOIA RUSSELII) IN BANGLADESH: ITS BOOM AND THREAT TO HUMAN LIFE – শিরোনামের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে রাসেলস ভাইপারের বিষ দুই ধরণের হয়। যথা: নিউরোটক্সিন, মায়োটক্সিন, নেফ্রোটক্সিন, এবং হেমোটক্সিন।

 

ভাইরাল পোস্ট কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য: রাসেলস ভাইপার সাপ খুবই দ্রুত বংশবিস্তার করে। এরা সরাসরি বাচ্চা দেয়। ৫০ থেকে ৮০ টি পর্যন্ত বাচ্চা দিতে পারে।

DESCF এর বক্তব্য: “দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং ১০০ টারও বেশি বাচ্চা প্রসব করে, এটা সত্য।”

অতএব, উপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সামাজিক মাধ্যমে রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে একাধিক তথ্য সংবলিত পোস্টের অনেক তথ্যই মিথ্যা, তবে কিছু তথ্য আংশিকভাবে সত্য।

এমন কয়েকটি পোস্টের নমুনা দেখবেন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে

সুতরাং, সবকিছু বিবেচনা করে ফ্যাক্টওয়াচ সামাজিক মাধ্যমে শেয়ারকৃত পোস্টের দাবিকে “আংশিক মিথ্যা” বলে সাব্যস্ত করছে।

সংশোধনী: ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন কর্তৃক “রাসেলস ভাইপারের বিষ একই সাথে ৫/৬ ধরণের হয়” তথ্যের বিপরীতে প্রদত্ত তথ্যের সংশোধন সাপেক্ষে বর্তমান প্রতিবেদনটি সংশোধন করা হল। তবে, পূর্বের “আংশিক মিথ্যা” রেটিং অপরিবর্তিত রয়েছে।

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে।।
এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকেঃ
ইমেইল করুনঃ contact@factwatch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh