ঢাকার মিরপুরে রাসেল’স ভাইপার পাওয়া গেছে?

Published on: July 4, 2024

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মিরপুরে একটি বাসার বাথরুম থেকে রাসেল’স ভাইপার সাপ পাওয়া গিয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে ঢাকা প্রকাশ এবং দৈনিক যুগান্তর। উক্ত সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের প্রকাশিত সংবাদে বাথরুমে পাওয়া সেই সাপের একটি ছবিও ব্যবহার করেছে। এই ছবিতে দৃশ্যমান সাপটিকেই রাসেল’স ভাইপার ভেবে মেরে ফেলা হয়েছিল। তবে, সংবাদমাধ্যমে ব্যবহৃত সেই সাপের ছবিটি দেখে ফ্যাক্টওয়াচ টিম নিশ্চিত হয়েছে যে, সেটি রাসেল’স ভাইপার ছিল না। বরং, নির্বিষ ঘরগিন্নি (Common Wolf Snake) সাপ ছিল। ঘরগিন্নি সাপের শারীরিক বৈশিষ্ট্য দেখে সাপটিকে চিহ্নিত করা গেছে। সঙ্গত কারণে ফ্যাক্টওয়াচ উক্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত সংবাদের দাবিকে “মিথ্যা” বলে সাব্যস্ত করছে।

 

অনুসন্ধান:

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর ১ নাম্বার চিড়িয়াখানা রোডের একটি বাসায় রাসেল’স ভাইপার “সদৃশ” সাপ মারা হয়েছে বলে খবর প্রকাশ করেছে ঢাকা প্রকাশ এবং দৈনিক যুগান্তর৷ উক্ত সংবাদমাধ্যমগুলোতে বলা হয়েছে, “শাহ আলী থানার এসআই শাহিদুল ইসলামের চিড়িয়াখানা রোডের বাসার বাথরুমে একটি রাসেল’স ভাইপারের বাচ্চা দেখা যায়। তিনি ডিউটিতে থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী তাকে ফোন করে সাপটি পিটিয়ে মেরে ফেলার খবরটি জানান। শাহিদুল ইসলাম তখন সাপের ছবিটি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন। ছবিটি পাওয়ার পর সেটি দেখে তার মনে হয়েছিল এটি রাসেল’স ভাইপার সাপের বাচ্চা। তার অনেক পরিচিতজনও এটিকে রাসেল’স ভাইপার সাপ বলে নিশ্চিত করেছে। পরবর্তীতে ঐ মৃত সাপের ছবিটি ফেসবুকে শেয়ার করার পর অনেকে এটিকে রাসেল’স ভাইপার বলে তাকে নিশ্চিত করেছেন।”

ছবির এই সাপটিকেই রাসেল’স ভাইপার বলে দাবি করা হয়েছে। এটি আসলে নির্বিষ ঘরগিন্নি সাপ। ছবি: ঢাকা প্রকাশ

ছবির সাপটি নির্বিষ ঘরগিন্নি। ছবি: দৈনিক যুগান্তর

ঢাকা প্রকাশ এবং দৈনিক যুগান্তর বাথরুমে দেখতে পেয়ে মেরে ফেলা সেই সাপের একটি ছবি তাদের খবরে প্রকাশ করেছে। তবে, তাদের প্রকাশিত সেই সাপের ছবিটি দেখে ফ্যাক্টওয়াচ টিম নিশ্চিত হয়েছে যে, সাপটি রাসেল’স ভাইপার নয়। বরং, সেটি নির্বিষ ঘরগিন্নি সাপ। এই সাপের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সাথে আলোচিত ছবিতে দৃশ্যমান সাপটির মিল রয়েছে। ঘরগিন্নি সাপের গায়ের রঙ ধূসর বাদামী, খয়েরী, এবং কালো বর্ণের হয়, এদের পিঠে কিছুটা বিরতি দিয়ে দিয়ে সাদা কিংবা হলদে রঙের চুড়ির মতো বলয় থাকে। এই বলয়ের কারণে অনেকে এটিকে ক্রেইট প্রজাতির কালাচ সাপ (Common Krait) বলে ভুল করেন। তবে, কালাচের শরীরের চুড়ির মতো বলয়গুলোর মাঝে ফাঁক কম থাকে এবং বলয়গুলো ঘরগিন্নির তুলনায় সরু হয়। ঘরগিন্নি সাপের মাথা তার ঘাড়ের তুলনায় চওড়া হয় এবং এর ঘাড়ের কাছেও চুড়ির মতো বলয় থাকে, যা দেখে এটিকে কালাচ সাপ থেকে আলাদা করা যায়। এদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে ছোট সরিসৃপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, প্রভৃতি রয়েছে এবং এরা রাতে শিকার করতে বের হয়। নির্বিষ হলেও ঘরগিন্নি সাপ কামড়ালে সেই জায়গায় প্রচুর ব্যথা হয়। মূলত মানুষের আবাসস্থল কিংবা এর আশেপাশে দেখতে পাওয়া যায় বলে এর নাম দেয়া হয়েছে ঘরগিন্নি।

নির্বিষ ঘরগিন্নি সাপ। ছবি: ইন্ডিয়ান স্নেকস

অন্যদিকে, রাসেল’স ভাইপারের মাথা ত্রিকোণাকৃতি বা অনেকটা ইংরেজি বর্ণমালা ‘V’ এর মতো দেখতে হয়। এদের মাথা ঘাড় থেকে চওড়া হয়। রাসেল’স ভাইপার সাপকে অন্যান্য সাপ থেকে আলাদা করে চেনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ফ্যাকাশে কমলা বাদামী রঙের পিঠের উপর লালচে বাদামী রঙের ডিম্বাকৃতি বা চাকতির মতো দেখতে কালো বর্ণের সীমানাযুক্ত বড় বড় বৃত্ত, যা মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত তিনটি সারিতে শেকলের মতো চলে গেছে। রাসেল’স ভাইপার সাপের শরীরে এই চাকতির মতো কালো রঙের সীমানাযুক্ত বৃ্ত্তগুলো কিছুটা চাঁদের মতো দেখতে হওয়ায় বাংলায় এই সাপকে বলা হয় চন্দ্রবোড়া। এর বাংলায় নামকরণ থেকে বুঝা যাচ্ছে, রাসেল’স ভাইপার বিদেশি কোন সাপ নয়। বরং, এই অঞ্চলের স্থানীয় সাপ। রাসেল’স ভাইপার সাপ তার অনন্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ত্বকের গঠনের কারণে এবং এর চামড়া দিয়ে শৌখিন জিনিস তৈরি হয় বলে শিকারীর শিকার হয়। বিপদের সম্মুখীন হলে রাসেল’স ভাইপার কুন্ডলী পাকিয়ে ‘ফোঁস ফোঁস’ শব্দ করে শত্রুকে লক্ষ্য করে সতর্কবার্তা পাঠাতে থাকে এবং ঘন ঘন নিঃশ্বাসের ফলে এর শরীর স্বাভাবিক আকারের চেয়ে বেশি ফেঁপে উঠে। রাসেল’স ভাইপার ডিম না পেড়ে সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে।

রাসেল’স ভাইপার। ছবি: উইকিপিডিয়া

অতএব, উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, ঢাকা প্রকাশ এবং দৈনিক যুগান্তর তাদের খবরে প্রকাশিত যে সাপটিকে রাসেল’স ভাইপারের বাচ্চা বলে দাবি করেছিল সেটি আসলে নির্বিষ ঘরগিন্নি সাপ।

ঢাকা প্রকাশের ফেসবুক পোস্টটি দেখুন এখানে। 

এর আগেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম অন্য সাপের ছবিকে রাসেল’স ভাইপার দাবি করে সংবাদ প্রকাশ করেছিল। সেগুলো নিয়ে ফ্যাক্টওয়াচের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদনগুলো পড়ুন এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে

সুতরাং, সবকিছু বিবেচনা করে ফ্যাক্টওয়াচ ঢাকা প্রকাশ এবং দৈনিক যুগান্তরের সংবাদগুলোকে মিথ্যা বলে সাব্যস্ত করছে।

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে।।
এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে
এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকেঃ
ইমেইল করুনঃ contact@factwatch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh