“কুমারীত্ব” নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর দাবি

Published on: May 13, 2022

সম্প্রতি নারীর “কুমারীত্ব” সম্পর্কে একটি তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে যে, হাইমেন (যোনিচ্ছদ বা সতীপর্দা) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পিছনে যৌন মিলন এককভাবে দায়ী। অর্থাৎ, কোনো নারী কুমারী কি না এ বিষয়টি তার হাইমেন পরীক্ষার মাধ্যমেই বুঝা যাবে। দাবিটি প্রমাণ করতে দুইটি যুক্তি দেখানো হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, নাচ, সাইকেল চালানো, সাঁতার, আরোহন বা দৌড়ানোর কারণে হাইমেন “ছিঁড়ে” না, এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ৯৯ শতাংশ সময় হাইমেন “ছিঁড়ে” যায় শুধুমাত্র যৌন মিলনের কারণে। উক্ত দাবির স্বপক্ষে প্রফেসর ডা: রেড্ডির একটি বইকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এমন কিছু ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

উক্ত দাবির যথার্থতা নির্ণয়ে এখানে দুইটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিকতা পায়

. হাইমেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পিছনে যৌন মিলন কি এককভাবে দায়ী?

. ডাঃ রেড্ডির বইয়ের দাবিটি কতটুকু সত্য?

 

হাইমেন কি এবং কি কি কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়?

হাইমেন বা যোনিচ্ছদ হচ্ছে মিউকাস মেমব্রেন দ্বারা সৃষ্ট একটি ভাঁজ যার মাধ্যমে যোনির প্রবেশমুখ আংশিক বা সম্পূর্ণ আবৃত হয়ে থাকে। উইকিপিডিয়ার হাইমেন সম্পর্কিত পেজের একদম প্রথম অনুচ্ছেদেই পরিষ্কার বলা হচ্ছে, কোনো নারীর যোনিচ্ছদ পরীক্ষা করেই কুমারীত্ব থাকা বা না থাকাটা নিশ্চিত করা যায় না। কারণ সেক্সুয়াল যৌন মিলন বা যৌনসঙ্গম ছাড়াও অনেক কারণে যোনিচ্ছদ ছিঁড়ে যেতে পারে।

আমেরিকার সেলফ ম্যাগাজিনে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরভিং মেডিকাল সেন্টারে কর্মরত সহকারী অধ্যাপক ড. মেরি রোজারের উদ্ধৃতি দিয়ে এই বিষয়টি আলোচনা করা হয়। সেখানে ড.রোজার বলেন, অসংখ্য কারণে হাইমেন প্রসারিত কিংবা ছিঁড়ে যেতে পারে। বিভিন্ন শারীরিক কাজকর্ম যেমন, সাইকেল চালানো, ঘোড়া দৌড়ানো, ব্যায়াম এবং এমনকি হস্তমৈথুনের কারণেও এটি ঘটতে পারে।

এছাড়া ডয়চে ভেলের এই প্রতিবেদনেও কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে:

১. প্রতি ১০০০ হাজার মেয়ে শিশুর একজন সতীচ্ছদ ছাড়াই ভূমিষ্ঠ হয়৷

২. শতকরা ৪৪ শতাংশ নারীরই প্রথমবার মিলনে কোনো প্রকার রক্তপাত হয় না৷

৩. খেলাধুলা কিংবা অন্য কোনো কারণে প্রাকৃতিক ভাবেই সতীচ্ছদ ফেটে যেতে পারে৷

৪. মাসিক রজঃস্রাবের সময় সতীচ্ছদে অবস্থিত ছিদ্র রক্ত প্রবাহকে স্বাভাবিক রাখতে প্রাকৃতিক ভাবেই বড় হয়ে যায়৷

৫. ‘টেমপন’ ব্যবহারের ফলে সতীচ্ছদ ছিড়ে যেতে পারে৷

৬. সতীচ্ছদ ফাটলেই রক্তক্ষরণ হবে – এটি ভুল ধারণা৷ রক্তক্ষরণ ছাড়াও সতীচ্ছদ ছিড়ে যেতে পারে৷”

এছাড়া, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস, ইংল্যান্ডের তথ্যমতে যৌন মিলন ছাড়াও, নিম্নোক্ত বিভিন্ন কারণে খুব সহজেই হাইমেন ছিড়তে পারে।

অর্থ্যাৎ, শুধুমাত্র যৌন মিলন নয়, বিভিন্ন কারণে হাইমেন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

ভার্জিনিটি বা কুমারীত্ব কি এবং হাইমেনের উপর ভিত্তি করে এটি কি পরীক্ষা করা যায়?

কোনো ব্যক্তির কোনো ধরণের যৌন মিলনের অভিজ্ঞতা না থাকাকেই “ভার্জিনিটি” বা “কুমারীত্ব” হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। তবে কুমারী কিংবা ভার্জিন বিশেষভাবে মেয়েদেরকেই বুঝানো হয়। কিন্তু কুমারীত্ব কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত বিষয় নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এটি একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয়ভাবে বিনির্মিত বিষয়, যা নারী এবং মেয়েদের প্রতি লিঙ্গ বৈষম্যকে প্রতিফলিত করে।

কোনো নারীর “কুমারীত্ব” তার হাইমেনের উপর নির্ভর করে না। ওহায়ো স্টেট কলেজ অব মেডিসিনের প্রফেসর জনাথন শাফির (Jonathan Schaffir) মতে, কোনো নারীকে পরীক্ষা করে এইটা জানা অসম্ভব যে সে কুমারী কি না।

অর্থ্যাৎ, শুধুমাত্র যৌন মিলন ছাড়াও আরো অন্যান্য কারণে হাইমেন প্রসারিত কিংবা ছিঁড়তে পারে। তাই হাইমেনের উপর ভিত্তি করে কারো যৌন মিলনের অভিজ্ঞতা ছিলো কি না তা বলা সম্ভব না।

 

ডাঃ রেড্ডির বইয়ের দাবিটি কতটুকু সত্য?

যে বইয়ের ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে তার নাম “দি এসেন্সিয়ালস অব ফরেনসিক মেডিসিন এন্ড টক্সিকোলজি (The Essentials of Forensic Medicine and Toxicology)”।এই বইয়ের লেখক ডা: কে. এস নারায়ণ রেড্ডি (Dr. K. S. Narayan Reddy) এবং ডাঃ ও. পি মূর্তি (Dr. O. P. Murthy) । বইটি ফরেনসিক সাইন্সের নানা দিক নিয়ে লিখা হয়েছে।

 

ভাইরাল স্ক্রিনশট:



 

প্রথম দাবি: “Hymen does not rupture by riding, jumping, dancing etc” অর্থ্যাৎ লাফালাফি, নাচ এসব কারণে হাইমেন “রাপচার” হয়না।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এখানে “রাপচার” বলে একটি নতুন শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। “রাপচার” এর আভিধানিক অর্থ ফেটে যাওয়া। কোনো জিনিস হঠাৎ এবং সম্পূর্ণভাবে ফেটে যাওয়া।

এই শব্দের সাথে হাইমেন ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা প্রাসারিত হওয়ার তফাৎ কোথায়? অর্থ্যাৎ, আমরা কখন বলবো হাইমেন ছিঁড়েছে বা কখন বলবো হাইমেন রাপচারড হয়েছে?

এর উত্তর জানতে হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ হাসপাতালের মেডিকাল অফিসার প্রসূণ কান্তি দেবের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তার কাছে হাইমেন টিয়ার, হাইমেন স্ট্রেচ এবং হাইমেন রাপচার এই শব্দগুলোর পার্থক্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, টিয়ার অথবা স্ট্রেচ মানে হচ্ছে হাইমেন পুরোপুরি ছিঁড়ে নাই, ফাটল ধরেছে বলা যায়। কিন্তু রাপচার মানে পুরোপুরি ছিঁড়ে যাওয়াকেই বুঝায়।

অর্থ্যাৎ, ডা: রেড্ডির বইয়ে হাইমেনের পুরোপুরি ছিঁড়ে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে।

এখন দেখা যাক এই বইয়ের উল্লেখিত অধ্যায়ে মূলত কী বলা হয়েছে। এই ১৬ নং অধ্যায়টির নাম ভার্জিনিটি, প্রেগন্যান্সি এবং ডেলিভারি। মূলত এই অধ্যায়ের একটি পৃষ্ঠার ছবিই ভাইরাল হচ্ছে।

বইটির এই অংশে, দুর্ঘটনাসহ হাইমেন র‍্যাপচারের ৭ টি কারণ দেখানো হয়। কারণগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায় সবগুলোই অস্বাভাবিকভাবে হাইমেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাই বলা হচ্ছে। এই কারণগুলোর মধ্যে কোথাও বলা হয়নি যে স্বাভাবিক যৌন মিলনের কারণে র‍্যাপচার হতে পারে।

অর্থ্যাৎ, এখানের আলোচ্য বিষয় অস্বাভাবিকভাবে হাইমেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। রাইডিং, জাম্পিং যেহেতু স্বাভাবিক ঘটনা তাই সেক্ষেত্রে হাইমেন পুরোপুরি ছিঁড়ে যায় না। বইটি যেহেতু অপরাধ বিজ্ঞানের উপর তাই এখানে ধর্ষণের দিকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিম্নোক্ত তথ্য থেকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ভার্জিনিটি পরীক্ষা এখনো অনেক মেডিক্যাল অনুশীলন কিংবা বইয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তবে তা শুধুমাত্র ধর্ষণ চিহ্নিত করার জন্য প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এখানেও ডা: রেড্ডির বইকে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

দ্বিতীয় দাবি: ৯৯% হাইমেন ছিঁড়ে যায় যৌন মিলনের কারণে।

এই দাবির পিছনে কোনো তথ্যসূত্র প্রদান করা হয়নি। এমন দাবির পিছনে যৌক্তিক কোনো প্রমানও খুঁজে পাওয়া যায়নি। উপরোক্ত বইয়ের একই অধ্যায়ের ৩৯২ পৃষ্ঠাতে বলা হচ্ছে, পুরোপুরি ছিঁড়ে নাই এমন হাইমেন একটি অনুমান মাত্র, কুমারীত্বের কোনো প্রমাণ নয়। এর দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে, প্রথমবার যৌন মিলনের কারণে হাইমেন ছিঁড়তে পারে, তবে তার আকৃতি হবে শুধুমাত্র একটি ফাটলের মত। আরো বলা হচ্ছে, এমনও দেখা যায় যে, প্রতিনিয়ত যৌন সঙ্গমের পরেও কারও হাইমেনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থ্যাৎ, যেখানে বলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত যৌন মিলনের পরেও হাইমেন অপরিবর্তিত থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে এককভাবে হাইমেন ছিঁড়ে যাওয়ার পিছনে যৌন মিলনকে দায়ী করা ভিত্তিহীন।

 

মূলত, অপরাধ বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে প্রকাশিত বইয়ের সাথে স্বাভাবিক অবস্থাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্ধেক তথ্য দেয়ার ফলে এক ধরনের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া, প্রথমবার যৌন মিলনের কারণে রক্তপাত হবে কি না সেটিও নিশ্চিত নয়। কারো ক্ষেত্রে এটি ঘটতে পারে, কারো ক্ষেত্রে নাও ঘটতে পারে। উভয়ক্ষেত্রেই বিষয়টি স্বাভাবিক। এর মাধ্যমে কারোও কুমারীত্ব নিশ্চিত করা যায় না।

ডা: তাসনিম জারার (ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস, ইংল্যান্ড) সাথে ফ্যাক্টওয়াচ যোগাযোগ করলে এই প্রতিবেদনের জন্য বিভিন্ন তথ্য দিয়ে তিনি সহায়তা করেন। ফ্যাক্টওয়াচকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই ধরনের অপতথ্য অনেক নারীর জন্যই বিপদের কারণ হতে পারে। তিনি এ নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করবেন বলেও আমাদের জানান।

পরবর্তীতে তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে এ সংক্রান্ত ভিডিওটি গতকাল প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি বলেন, “সহবাস ছাড়াও বিভিন্ন কারণে হাইমেন টান পড়তে পারে বা ছিড়ে যেতে পারে; যেমন, খেলাধুলা, আঘাত পাওয়া, মাসিকের সময় টেমপন ব্যবহার করা ইত্যাদি। তাই হাইমেন দেখে নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব না যে সে পুর্বে সহবাস করেছে কি না”।

এছাড়া ডাঃ রেড্ডির বইয়ের লেখা সম্পর্কে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনাইটেড ন্যাশন হিউমেন রাইটস, ইউনাইটেড ন্যাশন উইমেন এসব সংস্থার বিশেষজ্ঞদের রেফারেন্স দিয়ে তিনি বলেন, “প্রফেসর রেড্ডির ফরেনসিক বইসহ আরোও কিছু বইয়ে ভার্জিনিটি টেস্টিং নিয়ে অনির্ভরযোগ্য এবং অবৈজ্ঞানিক উপায় শেখানো হয়। তারা আহবান জানিয়েছেন যেনো এসব বইয়ে সর্বশেষ তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়”।

অতএব, ফরেনসিক মেডিক্যাল সাইন্সের ডা: রেড্ডির বইয়ে ধর্ষণের ক্ষেত্রে কুমারীত্ব প্রমাণের কয়েকটি পরীক্ষা পদ্ধতি আলোচনা করা হলেও সেগুলোও বিশেষজ্ঞদের মতে অবৈজ্ঞানিক। তার বইয়ের ভাষাকে অনেক ক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যাও করা হচ্ছে। হাইমেন ছিঁড়ে যাওয়ার পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। শুধুমাত্র যৌন মিলনকে দায়ী করা যাবে না। এছাড়া কোনো নারীর “কুমারীত্ব” পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায় না। “কুমারীত্ব” কিংবা “ভার্জিনিটি”র কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও নেই।

 

আপনি কি এমন কোন খবর দেখেছেন যার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন?
কোন বিভ্রান্তিকর ছবি/ভিডিও পেয়েছেন?
নেটে ছড়িয়ে পড়া কোন গুজব কি চোখে পড়েছে?

এসবের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে জানান।
আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@factwatch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh

Leave a Reply