রেসলিংঃ সত্য নাকি সাজানো নাটক?

Published on: October 31, 2022

Fact-File

 

রেসলিং বা কুস্তি একটি প্রাচীন খেলা। কালের পরিক্রমায় এর বিভিন্ন রূপ তৈরি হয়েছে। অন্যসব খেলার মত প্রতিযোগিতামূলক না হয়ে এটি বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। তবুও এর জনপ্রিয়তা কমেনি একটুও, বরং বেড়েছে। যখনই রেসলিং এর কথা আসে তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠে রক এবং জন সিনাদের মতো স্টারদের ছবি। একই সাথে একটি প্রশ্নও মাথায় আসে যে এরা কি আসলেই এভাবে মারামারি করে নাকি পুরোটাই মিথ্যা? প্রশ্নটি সহজ হলেও এর উত্তর কিছুটা জটিল। আজকের ফ্যাক্টফাইলে আমরা রেসলিং নিয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তি কাটানোর এবং প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করবো।

 

রেসলিং কি এবং এর ইতিহাস?

রেসলিং বা কুস্তি হচ্ছে এক ধরণের শারীরিক প্রতিযোগিতা। এটি একটি কৌশলভিত্তিক খেলা যেখানে দুই বা ততোধিক প্রতিযোগী নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের ভিত্তিতে লড়াই করে। যার মধ্যে ক্লিঞ্চ ফাইটিং, থ্রোস ও টেকডাউন, জয়েন্ট লক এবং বিভিন্ন ধরণের গ্র্যাপলিং এর মতো কৌশলগুলো দেখতে পাওয়া যায়।

 

পাঁচ হাজার বছর আগে, সুমেরিয়ানদের সময়ে প্রথম সলিং খেলার বিকাশের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন মিশরেও রেসলিং খেলার অনেক ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সন্ধান পাওয়া গিয়েছিলো। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বেনি-হাসানের সমাধিতে প্রাপ্ত ছবি যেখানে প্রায় ৮০০ জন রেসলারের উপস্থিতি দেখা যায়। এই ছবিগুলো এবং সেইসাথে আরও অনেক নমুনা প্রাচীন মিশরে রেসলারদের সংঘবদ্ধভাবে কাজ করা এবং রেসলিং এর নিয়মকানুনের প্রমাণ দেয়।

 

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ফ্রান্সে পেশাদার রেসলিং শুরু হয়। যেসব রেসলাররা রেসলিং এর অভিজাত দলে ঢুকতে পারতো না তারা আলাদা দল তৈরি করে পুরো ফ্রান্স ঘুরে বেড়াতো এবং তাদের রেসলিং দক্ষতা প্রদর্শন করতো।

 

বর্তমানে সলিং এর দুইটি রূপ দেখতে পাওয়া যায়। একটি প্রতিযোগিতামূলক এবং অন্যটি বিনোদনমূলক। প্রতিযোগিতামূলক রেসলিংকে বলা হয় অ্যামেচার রেসলিং এবং বিনোদনমূলক রেসলিংকে প্রফেশনাল বা প্রো-রেসলিং হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

 

সলিং প্রাচীন রেসলিং এর যে ধরণগুলো ছিলো তার সাথে অনেকটা সামঞ্জস্যপুর্ণ। গণবিনোদনের জন্য নয় বরং প্রতিযোগিতামূলক হওয়াই ছিলো এর বৈশিষ্ট্য। স্কুল বা কলেজ পর্যায় থেকে শুরু করে অলিম্পিক পর্যন্ত এই খেলার প্রসার রয়েছে। অলিম্পিকে সাধারণত দুই ধরণের রেসলিং দেখা যায়। একটি হচ্ছে ফ্রি-স্টাইল এবং অন্যটি গ্রেকো-রোমান। ফুটবল খেলা যেমন নিয়ন্ত্রিত হয় ফিফার দ্বারা কিংবা ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ করে আইসিসি তেমনি এই রেসলিং নিয়ন্ত্রিত হয় ইউনইট ওয় সলিং এর দ্বারা। সব ধরণের রেসলিংকে বিশ্বের সব মহাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে ১৯০৫ সালে জার্মানিতে এই সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। এটি আর অন্য সব খেলার মতই বাস্তব এবং প্রতিযোগিতামূলক।

 

রফশন সলিং মূলত থিয়েটার পারফরম্যান্স, যার মূল লক্ষ্য বিনোদন। তবে এখানে ব্যবহৃত বিভিন্ন কৌশলগুলো অ্যামেচার রেসলিং থেকেই নেয়া। এই পারফরম্যান্সগুলোতে একটি গল্প দেখতে পাওয়া যায় যেখানে কেউ নায়ক এবং কেউ খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে।

অ্যামেচার রেসলিং এবং প্রো-রেসলিং এর মধ্যে কিছু থক রয়েছে। যেমন:

  • প্রো-রেসলিং-এ নিয়মকানুন পরিষ্কার থাকে না। এর পুরোটাই নির্ভর করে একটি স্ক্রিপ্টের উপর; অন্যদিকে অ্যামেচার রেসলিং বাকি সব খেলাধুলার মতই নির্দিষ্ট নিয়মকানুন দ্বারা পরিচালিত হয়।
  • প্রো-রেসলিং এর মূল লক্ষ্য বিনোদন। অন্যদিকে, অ্যামেচার রেসলিং এর লক্ষ্য প্রতিযোগিতা।
  • অ্যামেচার রেসলিং এ প্রতিযোগীরা মেঝে বা মাটির উপর খেলে। অন্যদিকে, প্রো-রেসলিং এ বক্সিং এর মতো রিং থাকে।
  • অ্যামেচার রেসলিং এর ফলাফল নির্ভর করে অর্জিত স্কোরের উপর কিন্তু প্রো-রেসলিং এর ফলাফল পূর্ব নির্ধারিত।
  • অ্যামেচার রেসলিং এ কোনো ধরণের অস্ত্র ব্যবহার করা যায় না কিন্তু প্রো-রেসলিং এ চোখের সামনে পাওয়া যায় এমন প্রায় সবই ব্যবহার করা যায়।

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রো-রেসলিং এর অনকগ রয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকার, ওয়ার্ল্ড রেসলিং এন্টারটেইনমেন্ট (WWE), অল এলিট রেসলিং (AEW), রিং অফ অনার (ROH) ইত্যাদি অন্যতম। এছাড়া মেক্সিকো, জাপানের অনেকগুলো সংস্থা বিশ্বে অনেক জনপ্রিয়। বিভিন্ন দেশে এমন অনেকগুলো সংস্থার একটি তালিকা দেখুন এখ

 

প্রো-রেসলিং কি সত্যি না কি মিথ্যা?

 

প্রো-রেসলিং নিয়ে অনেকের মধ্যেই এক ধরণের বিভ্রান্তি চোখে পড়ে। কেউ ভাবেন রেসলিং সম্পূর্ণ বাস্তব আবার অন্যরা মনে করেন রেসলিং পুরোটাই মিথ্যা। প্রো-রেসলিং শো WWE বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে খুব জনপ্রিয়।

উপরের আলোচনা থেকে রেসলিং সত্য নাকি মিথ্যা এর উত্তর কিছুটা ধারণা করা যায়। অর্থাৎ, রেসলিং এর সত্য-মিথ্যা নির্ভর করে খেলার ধরণের উপর। অ্যামেচার রেসলিং যেহেতু পুরোদস্তুর প্রতিযোগিতামূলক একটি খেলা তার মানে এখানে বানোয়াট কিছু নেই। অন্যদিকে, প্রো-রেসলিং যেহেতু বিনোদনমূলক খেলা তাই এটি অনেকটাই পূর্বপরিকল্পিত। নাটক বা সিনেমাতে যেমন স্ক্রিপ্ট থাকে তেমনি প্রো-রেসলিংও স্ক্রিপ্ট নির্ভর। অর্থাৎ, রেসলিং নাটক বা সিনেমার মতই সত্য এবং মিথ্যা।

ওয়ার্ল্ড রেসলিং এন্টারটেইনমেন্ট (WWE) বাংলাদেশসহ বিশ্বে অন্যতম জনপ্রিয় একটি রেসলিং প্রমোশন। আমরা অনেকেই রক, জন সিনা, আন্ডারটেকার, বিগ শো কিংবা দ্য গ্রেট কালির নাম শুনেছি। এরা সবাই WWE স্টার। প্রো-রেসলিং এর সত্যতা বোঝার জন্য WWE কে পর্যালোচনা করা যায়। WWE এর তৎকালীন মালিক ভিন্স ম্যাকমেহন (Vince McMahon) একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৯৮৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সম্পূর্ণ বিষয়টি খোলাসা করেন। তিনি বল, প্রো-রেসলিংকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা উচিত যেখানে অংশগ্রহণকারীরা একটি বাস্তবসম্মত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা পরিচালনা করার পরিবর্তে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার উদ্দেশ্যে লড়াই করে (“an activity in which participants struggle hand-in-hand primarily for the purpose of providing entertainment to spectators rather than conducting a bona fide athletic contest”)। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, WWE নিজেদের “Sports Entertainment” হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নামের মধ্যেই ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ শব্দটি রয়েছে।

 

WWE এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৫০ সালে। পরবর্তীতে ২০০২ এ এসে এর বর্তমান নামকরণ করা হয়। এখানে দেখানো সম্পূর্ণ বিষয়গুলোই পূর্বপরিকল্পিত থাকে। কে কখন জিতবে বা হারবে, কিংবা রেসলাররা কি কথা বলবে বা কি করবে প্রায় সবকিছুই একটা নির্দিষ্ট স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী হয়। এমনকি এটি পরিচালনার জন্য পেশাদার স্ক্রিপ্ট রাইটারও নিয়োগ দেওয়া হয়। সিনেমার মতোই এখানে একটি লিখিত গল্প থাকে। অনেকটা থিয়েটারে দেখানো নাটকের মতো।

তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, প্রো-রেসলিং এর রিং কিংবা এর বাইরে আমরা যে মারামারিগুলো দেখি তা মিথ্যা নয়। সেখানে দেখানো মারামারির অনেক কৌশল অথবা মারামারি করতে গিয়ে প্রাপ্ত আঘাত, ঘাম, রক্তপাত এর কোনোটিই মিথ্যা নয়। সিনেমাতে আমরা অনেক ধরণের স্টান্ট দেখি যেগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তি বা অনেক সময় নায়ক নিজে কিংবা পেশাদার স্টান্টম্যানদের সহায়তায় সম্পন্ন করেন। রেসলিং এ স্টান্টম্যান নেই। এখানে রেসলারদেরই এই স্টান্টগুলো করতে হয় এবং সেক্ষেত্রে তাদের কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকে না। তবে অবশ্যই সেগুলো আগে থেকে অনেক অনুশীলন করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে দর্শকের সামনে এসে প্রদর্শন করতে হয়।

 

অর্থাৎ, প্রো-রেসলিং বাকিসব অ্যামেচার রেসলিং এর মতো প্রতিযোগিতামূলক নয়। এটি পরিকল্পিতভাবে সাজানো। তবে একে “মিথ্যা” বলাটাও যৌক্তিক নয়। কেননা সেখানে দেখানো প্রতিটা অ্যাকশন বাস্তব। প্রো-রেসলিং এর এই বিষয়টিকে “Kayfabe” বলা হয় মানে যা কিছু সত্য হিসেবে উপস্থাপিত হয় কিন্তু আদতে স্ক্রিপ্টেড। এ বিষয়ে বিজনেস ইনসাইডারের একটি ভিডিও দেখুন এখ

সুতরাং, রেসলিং মিথ্যা এই কথাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। কেননা অ্যামেচার রেসলিং বা অলিম্পিকে আমরা যে রেসলিংটি দেখি তা অন্যসব স্পোর্টসের মতই সত্য। তবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় যে রেসলিংটি তার নাম প্রো-রেসলিং বা পেশাদার রেসলিং। এটি পূর্বপরিকল্পিত, সাজানো এবং কোরিওগ্রাফড। অন্য যেকোনো স্টেজ শো’র মতই এটি। ঠিক যে কারণে আমরা কোনো স্টেজ পারফরমেন্সকে মিথ্যা বলি না একই কারণে এটিকেও মিথ্যা বলা দুষ্কর।

আপনি কি এমন কোন খবর দেখেছেন যার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন?
কোন বিভ্রান্তিকর ছবি/ভিডিও পেয়েছেন?
নেটে ছড়িয়ে পড়া কোন গুজব কি চোখে পড়েছে?

এসবের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে জানান।
আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@factwatch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh