করোনা মোকাবেলায় হোমিওপ্যাথি কি কার্যকর?

দেশের পত্রপত্রিকায় করোনার চিকিত্সায় হোমিওপ্যাথির ব্যবহার নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে সরকারিভাবে বিতরণ করা হয়েছে করোনা প্রতিরোধে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ। হোমিওপ্যাথির জনপ্রিয়তা যেমন অগ্রাহ্য করা যাবে না, তেমনি এ-ও মানতেই হবে যে আজ পর্যন্ত হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায় নি। অন্যান্য রোগের মত করোনার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য।

মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে মানুষ আতংকিত হয়ে পরে এই রোগের চিকিৎসা ও প্রতিষেধকের খোঁজে। চারিদিকে একটাই প্রশ্ন, কিভাবে রোধ করা সম্ভব এই মহামারীকে। তারই জের ধরে ছড়িয়ে পরে বিভিন্নরকম ‘চিকিৎসা’ পদ্ধতির ব্যবহার ও তার কার্যকারিতা কথা। করোনা মোকাবেলায় এসব নানা রকম ‘চিকিৎসা’ পদ্ধতির মাঝে রয়েছে হার্বাল, ঘরে বানানো বটিকা, বিভিন্ন টোটকা এবং সর্বশেষ সংযোজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা। আজকের বিষয় করোনা চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি ঠিক কতটুকু কার্যকর? মহামারী চলাকালীন গণমাধ্যম এই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জনগণের কাছে কিভাবে তুলে ধরছেন এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত কি?

গত ২৯ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক ‘করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে হোমিওপ্যাথি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ঠিক এর পরের দিন ৩০ জানুয়ারি ‘হোমিওপ্যাথি ওষুধে প্রতিরোধ হবে মরণঘাতী করোনাভাইরাস!’ শিরোনামে একইধরণের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন।  অথচ তখনো এই রোগের চিকিৎসায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো হোমিওপ্যাথি ঔষধ আবিষ্কার কিংবা ব্যবহার হয়নি। অনলাইন পোর্টাল ঢাকা টাইমস ‘হোমিও ওষুধে সুফল মিলছে করোনার চিকিৎসায়!‘ শিরোনামে প্রায় একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ২রা জুন। যেখানে ভুল তথ্যে জর্জরিত মানুষ এদিক সেদিক ছুটছে এই মহামারী থেকে পরিত্রাণের আশায় সেখানে উক্ত প্রতিবেদনগুলোর শিরোনাম বিভ্রান্তিকর। অবৈজ্ঞানিক এবং অপ্রামাণিত কোনো ঔষধ নিয়ে আদৌ এমন প্রচারণা চালানো আসলে কতটুকু যৌক্তিক যেখানে ভুল চিকিৎসায় রোগীর ক্ষতি হবার সম্ভাবনাটুকু থেকেই যায়।

 

 

 

 

 

 


গত ১৩ জুন দৈনিক যুগান্তরে ‘হোমিওতে করোনার চিকিৎসা সম্ভব, পাবনার চিকিৎসকের দাবি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশেও হোমিওপ্যাথির চিকিৎসায় করোনা মুক্ত করা সম্ভব বলে দাবি করেছেন পাবনার একজন হোমিও চিকিৎসক ডা. আমিরুল ইসলাম সানু। তার দাবী তিনি প্রায় ২ হাজার রোগীর চিকিৎসা করেছেন এই পদ্ধতিতে। করোনার লক্ষণভিত্তিক কিছু হোমিও ওষুধের পরামর্শ দিয়েছেন পাবনার হোমিওতে স্নাতকধারী এই চিকিৎসক! অথচ রোগীর উপসর্গ সরাসরি না দেখে কিভাবে একজন চিকিৎসক এভাবে ঔষধের পরামর্শ দিতে পারেন এবং সেটি একটি জাতীয় দৈনিক প্রকাশ করতে পারে এটিও প্রশ্নবিদ্ধ।

 

 

 

 

 

 

 


অন্যদিকে এই মহামারী চলাকালীন ফেসবুকের বিভিন্ন পেইজে চলেছে লাগাতার হোমিওপ্যাথির বিজ্ঞাপন। সেখানে নেই কোনো রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরিচয়, নেই চিকিৎসা প্রদানের কোনো নীতিমালা, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা। এমনই একটি ফেসবুক পেইজ ‘হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা’, যেখানে নিয়মিত কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় বিভিন্ন ঔষধের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

 

 

 

 

 

 

 

 


পাবনার ভাঙ্গুড়া পৌরশহরের ছয় হাজার পরিবারের প্রায় ২৪ হাজার সদস্যকে বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথিক Arsenic Album 30 ঔষধ সরবরাহ করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। ভাঙ্গুড়া পৌর মেয়র গোলাম হাসনাইন রাসেল শহরের নয়টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের মাধ্যমে মঙ্গলবার হোমিওপ্যাথিক ঔষধ পৌঁছে দেন। তিনি বলেন, “পৌরবাসীকে করোনামুক্ত রাখতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইন অনুসরণ করে সকল ব্যবস্থাই নিয়েছি।“ (১০ জুন, কালেরকন্ঠ) অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইনের কোথাও লেখা নেই করোনার চিকিৎসায় কিংবা প্রতিষেধক হিসেবে Arsenic Album 30 এর ব্যবহারের কথা।

মানিকগঞ্জের ঘিওরে ‘করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অনুযায়ী করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক পাওয়া যায় ও চিকিৎসা দেয়া হয়’ লেখা সম্বলিত প্রচারপত্র বিলির মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে প্রতারিত করার জন্য আটক হয়েছেন এক হোমিও চিকিৎসক। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মোবাইল কোর্ট ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৪৪ ধারায় ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। সুত্র- (১৩ মার্চ, নয়াদিগন্ত)

 

 

 

 

 


তবে হোমিও চিকিৎসকদের দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জনস্বাস্থ্যবিদ ও প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী দৈনিক ভোরের কাগজকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, “আমরা সাধারণত কথা বলি বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত, সমীক্ষা ও গবেষণার ভিত্তিতে। হোমিওপ্যাথি ওষুধ করোনা চিকিৎসায় কার্যকর পৃথিবীর কোথাও এখন পর্যন্ত সমীক্ষায় বা গবেষণায় এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, নিরাপদ থাকতে একটি ভ্রান্ত ধারণা থেকেই মানুষ হোমিওপ্যাথির দিকে ঝুঁকছে। যা করার কোনো প্রয়োজন নেই। অনেক দিন ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাবি করা হচ্ছে ক্যান্সারের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি কার্যকর। তবে কোনো গবেষণায় তা প্রমাণিত হয়েছে, এমন কোনো তথ্য নেই। তাই বলব, যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের হোমিওপ্যাথ খাওয়ানো মোটেই নিরাপদ নয়। কারণ, আমরা জানি করোনায় আক্রান্ত অনেক রোগী শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ভালো হচ্ছেন।“

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কি হচ্ছে?

গত ৯ জুন বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরে একটি মতামত কলাম প্রকাশিত হয় ‘কোভিড-১৯: ব্যবহৃত হোমিওপ্যাথির ওষুধ ও চিকিৎসা’ শিরোনামে। সেখানে লেখক বলেছেন “ভারতের প্রায় সবকয়টি রাজ্য আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথি ওষুধপ্রয়োগ করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপক প্রচলন শুরু করেছে এবং এ বিষয়ে অভূতপূর্ব সাড়া মিলছে। হোমিওপ্যাথি ওষুধ আর্সেনিকাম অ্যালবাম ৩০ দিনে একবার করে তিনদিন খেতে বলা হয়েছে।“

অপরদিকে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যেখানে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ মেলেনি যা থেকে বলা যায় এটি করোনার বিরুদ্ধে কার্যকর। আর্সেনিক অ্যালবাম একটি সাধারণ হোমিওপ্যাথিক ওষুধ যা সাধারণ সর্দি, কাশি বা ফ্লুর চিকিত্সার জন্য ব্যবহৃত হয়। পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া না থাকায় অনেকেই এটিকে প্রাধান্য দেন, কিন্তু একই সাথে একটি রোগে আক্রান্ত বিভিন্ন মানুষের দেহে বিভিন্নরকম উপসর্গ দেখা যেতে পারে। তাই এর কার্যকারিতার সর্বজনীনতা নেই। যদিও জুনের ৫ তারিখে ‘Homeopathy combat against coronavirus disease (Covid-19)’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় যেখানে গবেষকরা বলছেন করোনা মোকাবেলায় হোমিওপ্যাথি’র কিছু ঔষধ বেশ কার্যকরী। কিন্তু সেই গবেষণায় পরীক্ষার অংশ হিসেবে কোনো বড় মাপের  ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে বলে উল্লেখ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কয়েকটি অ্যালোপ্যাথি ওষুধের মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা করতে হবে। ভারতে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতে হোমিওপ্যাথি ওষুধ ব্যবহার করে ভারতের ভোপালের একটি সরকারি হাসপাতাল যা নিয়ে চিকিৎসক মহলে বিশাল বিতর্ক শুরু হয়েছিলো। উল্লেখ্য ভারতের শতকরা ১০ ভাগ মানুষ হোমিওপ্যাথির উপর প্রত্যক্ষভাবে আস্থা রাখেন।

 

তথ্যসূত্র

ইত্তেফাকের প্রতিবেদনটি পড়ুন এখানে

বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদন

যুগান্তরের প্রতিবেদন

ফেসবুক পেইজ ‘হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

কালেরকন্ঠ

দৈনিক ভোরের কাগজ

বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরে মতামত কলাম

টাইমস অফ ইন্ডিয়ার  প্রতিবেদনটি পড়ুন

Homeopathy combat against coronavirus disease (Covid-19)

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন

আপনি কি এমন কোন খবর দেখেছেন যার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন?
কোন বিভ্রান্তিকর ছবি/ভিডিও পেয়েছেন?
নেটে ছড়িয়ে পড়া কোন গুজব কি চোখে পড়েছে?

এসবের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে জানান।
আমাদেরকে ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ fb.com/search.ulab

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *