শেখ হাসিনাকে ভারতে দেখা যাওয়ার দাবিতে পুরোনো ভিডিও-ছবি প্রচার

24
শেখ হাসিনাকে ভারতে দেখা যাওয়ার দাবিতে পুরোনো ভিডিও-ছবি প্রচার
শেখ হাসিনাকে ভারতে দেখা যাওয়ার দাবিতে পুরোনো ভিডিও-ছবি প্রচার

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে একাধিক ভিডিও, ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ছবি-ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লিতে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, দিল্লি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আবার আরেকটি ভিডিও দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, দিল্লি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে সশরীরে পৌঁছেছেন শেখ হাসিনা। ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব ছবি ও ভিডিও পুরোনো ও ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার। এসবের সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার কোনো সম্পর্ক নেই। 

দাবি ১ঃ দিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আজ তার নিজ বাসভবনে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটি সৌজন্য সাক্ষাৎে মিলিত হন

এই দাবিতে প্রচারিত কিছু ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে। 

এই দাবিতে প্রচারিত ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও বৈঠক করছেন। ছবিগুলো রিভার্স ইমেজ সার্চে ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। 

২০২৪ সালের ১০ জুন প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ওই সময়  তৃতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নয়াদিল্লি যান শেখ হাসিনা। সে সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির (সিপিপি) চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী, কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী এবং সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। নয়াদিল্লিতে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

কংগ্রেসের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টেও (সাবেক টুইটার) ২০২৪ সালের ১০ জুন প্রকাশিত এই সাক্ষাতের ছবি, ভিডিও পাওয়া যায়।  

ভারতীয় কোনো সংবাদমাধ্যমেও সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। 

ফলে এটি নিশ্চিত হওয়া যায়, ভারতে বর্তমানে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে এই ছবিগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। ছবিগুলো বছর খানেক পুরোনো। 

দাবি ২ঃ দিল্লি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন শেখ হাসিনা 

এই দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত কিছু ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে। 

এই ভিডিওগুলো থেকে কিছু কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইটিভি ভারতের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ২১ জুন এটি প্রকাশিত হয়। 

ইউটিউবের বিস্তারিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে সেই সময় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছেন। শেখ হাসিনার এই সফরটিই ছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট টানা তৃতীয়বার সরকার গঠনের পর কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর।

একই তথ্য জানা যায় ২০২৪ সালের ২১ জুন দেশীয় সংবাদমাধ্যম দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন থেকেও। প্রতিবেদনটি পড়ুন- নয়াদিল্লি পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী 

অর্থাৎ, দিল্লি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে শেখ হাসিনা ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে পৌঁছার দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার ও পুরোনো। 

দাবি ৩ঃ দিল্লি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে শেখ হাসিনা পৌঁছেছেন 

এই দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত কিছু ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে। 

এই ভিডিওগুলো থেকে কিছু কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চে দেশীয় সংবাদমাধ্যম সময় টিভির ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ভিডিওটি ওই সময় যুক্তরাজ্যের লন্ডনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান থেকে ধারণ করা। 

দিল্লি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে শেখ হাসিনা পৌঁছার দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির সঙ্গে এটির মিল পাওয়া যায়। 

পরে আরও খুঁজে দেখা যায়, ওই সময় লন্ডনের সেন্ট্রাল হল ওয়েস্টমিনস্টারে শেখ হাসিনাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এটির আয়োজন করে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। 

অর্থাৎ এই ভিডিওটিও পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার। 

দিল্লির প্রেস কনফারেন্সে শেখ হাসিনার অংশগ্রহণ নিয়ে যা জানা যায় 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছুদিন ধরেই প্রচার করা হচ্ছিল, গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্স ক্লাবে কিছু মানবাধিকার সংস্থার আয়োজিত অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকবেন। এমন প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী (নওফেল) তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন। 

২৩ জানুয়ারি দেওয়া এই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, ‘আজ ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্স ক্লাবে কিছু মানবাধিকার সংস্থার আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে বঙ্গবন্ধুর কন্যা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতি বা সরাসরি সংযুক্ত থাকা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। এ বিষয়ে আয়োজক সংস্থা—ইন্টারন্যাশনাল প্রেসক্লাব অ্যাসোসিয়েশন, সহযোগিতায় বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ইউএসএ এবং গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স—আমাকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি উপস্থিতি বা লাইভ সংযুক্ত থাকার কোনো ঘোষণা তারা কখনোই দেননি। তারা জানিয়েছেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববাসী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে একটি অডিও বার্তা উপস্থাপন করবেন। সরাসরি উপস্থিত থাকা বা লাইভ সংযুক্ত থাকার বিষয়টি কখনোই আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়নি। আশা করছি, এতে করে সকল ধরনের বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে।’ 

ভারতীয় কোনো সংবাদমাধ্যমেও শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে আসা বা দিল্লিতে আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে সরাসরি অংশগ্রহণের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং তার একটি অডিও বার্তা উপস্থাপনের তথ্য পাওয়া যায়। ফলে ফ্যাক্টওয়াচ উপরিউক্ত দাবিগুলোকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে। 

Claim:
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে একাধিক ভিডিও, ছবি ছড়িয়ে পড়েছে।

Claimed By:
Facebook Users

Rating:
False

এই নিবন্ধটি ফেসবুকের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রামের নীতি মেনে লেখা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ফেসবুক যে ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে

এছাড়া এই নিবন্ধ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন, সম্পাদনা কিংবা আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার জন্য আবেদন করতে এই লিঙ্কের সাহায্য নিন।

কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে আমাদেরকে
ইমেইল করুনঃ contact@fact-watch.org
অথবা ফেইসবুকে মেসেজ দিনঃ facebook.com/fwatch.bangladesh